মজিদ :
মজিদ স্বার্থপরতা, প্রতারণা, শঠতা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের প্রতীক। মিথ্যা ও কূটকৌশল অবলম্বন করে সে মোদাচ্ছের পীরের মাজার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ ও সম্মানে প্রতিষ্ঠা পেতে তৎপর হয়েছে। নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি সুদৃঢ় করার জন্য গ্রামবাসীকে ফসল ওঠার আনন্দে গান গাওয়ার প্রচলন বন্ধ করে, নামাজ পড়া ও দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করে, মেয়েদের স্বচ্ছন্দ চলাফেরায় বাধা দেয়। মাতব্বর খালেক ব্যাপারীর সঙ্গে স্বার্থের খাতিরে একজোট হয়ে মজিদ তাহের-কাদেরের বাবাকে মেয়ের । কাছে মাফ চাইতে বাধ্য করে। এ অপমান সহ্য করত না পেরে সে নিখোঁজ হয়। শিক্ষিত যুবক আক্কাস মহব্বতনগর গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়াতে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে কৌশলে মজিদ তার স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নস্যাৎ করে দেয়। আওয়ালপুরে আসা পীরের প্রভাব থেকে নিজেকে নির্ভাবনায় রাখতে খালেক ব্যাপারীর স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করে। এভাবে মজিদ আশেপাশের গ্রামের সবাইকে প্রভাবিত করে মাজার সচল রাখে। এখন তার কথায় সবাই ওঠে বসে। ঘরে স্ত্রী রহিমা থাকতেও সে অল্পবয়সী জমিলাকে বিয়ে করে। খালেক ব্যাপারীর প্রথম স্ত্রী আমেনা বিবির সুন্দর পা দেখে তার কামনার আগুন জ্বলে ওঠে। কিশোরী স্ত্রী জমিলার স্বতঃস্ফূর্ত হাসি, চপলতা, সাজগোজ বন্ধ করতে গিয়ে মজিদ তাকে শাস্তি দেয়। কিন্তু মানবিক অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে মজিদের অন্তরও একপর্যায়ে প্রাণধর্মে তীব্র হয়ে ওঠে। শিলাবৃষ্টিতে ধ্বংস হওয়া ফসলের মাঠ দেখে তার মধ্যে ভণ্ড, ধর্মব্যবসায়ী ও প্রতারক শোষকের চরিত্র জেগে ওঠে। মজিদ 'লালসালু' উপন্যাসের এক একাকী, মানবিক দায়বিহীন, নিঃসঙ্গ, ভণ্ড ও স্বার্থপর চরিত্র।
খালেক ব্যাপারী :
খালেক ব্যাপারী সামন্তবাদী সমাজের প্রতিভূ চরিত্র। সে মহব্বতনগর গ্রামের মাতব্বর। গ্রামের মানুষের উৎসব অনুষ্ঠান, ধর্ম ও ধর্মশিক্ষা সবকিছু তার নির্দেশ ও পরামর্শেই পরিচালিত হয়। তার জমিজমা, অর্থ-সম্পদের অভাব নেই। গ্রামের মানুষদের সুখে-দুঃখে, আনন্দ-গানে কখনো বাধা দেয় না সে। তবে তার মধ্যে সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ় ব্যক্তিত্বের বড় অভাব। মজিদের মতো ভণ্ড, ধর্মব্যবসায়ী ও প্রতারকের কৌশলের কাছে সে পরাজিত হয়েছে, শেষে তার সঙ্গে একাট্টা হয়েছে। বিরোধিতা বা প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, উলটো মজিদের সব কাজে সমর্থন জুগিয়েছে এবং সিদ্ধান্তে সহযোগিতা করেছে। এমনকি তার আদেশ নির্বিবাদে মেনে নিয়ে তেরো বছরের দাম্পত্য জীবনের সব অঙ্গীকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে প্রথমা স্ত্রীকে পর্যন্ত ত্যাগ করেছে। খালেক ব্যাপারী মাতব্বর হলেও মূলত সে শান্তিপ্রিয়, ধর্মপ্রাণ ও কোমল হৃদয়ের।
জমিলা :
জমিলা 'লালসালু' উপন্যাসের অন্যতম প্রধান নারী চরিত্র। কিশোরী জমিলা মজিদের দ্বিতীয়া স্ত্রী। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও প্রাণধর্মে সে উচ্ছল এবং প্রতিবাদী। জমিলা উচ্ছল হাসি হাসে এবং কৌতুককর কথা বলে। জমিলা স্বামীর বয়স নিয়ে কটাক্ষ করে এবং স্বামীর রক্তচক্ষু-শাসন মানতে চায় না। সে মজিদের নিষেধ উপেক্ষা করে, তার ধমককে অবহেলা করে। এমনকি নামাজ পড়তে পড়তেই জায়নামাজে ঘুমিয়ে পড়ে। মজিদের কোনো কথার জবাব না দিয়ে সে চুপ করে থাকে। বিয়ের প্রথম দিকে জমিলা বেশ নরম ও শান্ত ছিল। পরে ধীরে ধীরে মজিদের ক্রুদ্ধ স্বভাব, স্নেহ-মমতাহীন কথাবার্তা ও আদেশ-নির্দেশ শুনে মনে মনে জমিলা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। মজিদকে সে বিচলিত, ভীত, উত্তেজিত ও ক্ষিপ্ত করে তোলে। স্বামীর কাছে সে যায় না, রহিমার কাছে গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমায়। নিঃসঙ্গ বুড়ির কান্না জমিলাকে কষ্ট দেয়। মাজার ও মজিদের প্রতি সে বিরূপ হয়ে ওঠে। মজিদের অন্যায়, শোষণ, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের সে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। এভাবে জমিলা আত্মসমর্পণ না করে নীরব বিদ্রোহ করে। ধীরে ধীরে সে তার প্রাণধর্মের প্রেরণা রহিমার মধ্যেও জাগিয়ে তোলে। কিশোরী বধূ জমিলার আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে মজিদ চরিত্রের স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয়েছে।
রহিমা :
'লালসালু' উপন্যাসের অন্যতম প্রধান নারী চরিত্র রহিমা। সে মজিদের প্রথমা স্ত্রী। সরল ও শান্ত স্বভাবের রহিমা স্বামীর একান্ত অনুগত এবং স্বামীর গৌরবে গর্বিত। লেখকের ভাষায়- “তার শক্তি, তার চওড়া দেহ- তা বাইরের খোলসমাত্র, আসলে সে ঠান্ডা ভিতু মানুষ।" স্বামী তাকে ধীর পায়ে নিঃশব্দে হাঁটতে বললে বা আস্তে কথা বলতে বললে সে তাই মেনে চলে। ধর্মকর্ম সম্পর্কে সব রকম কথা সে নির্বিবাদে বিশ্বাস করে। রহস্যময় মাজারটির নিচে একটি অলৌকিক শক্তি আছে বলে সে বিশ্বাস করে। তার স্বামীকেও সে অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন মানুষ মনে করে। সাংসারিক কাজকর্মেও সে অসাধারণ পারদর্শী। মা হতে পারেনি বলে তার দুঃখ হয়। স্বাভাবিক সৌজন্যবোধ, দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট মানুষের প্রতি দয়ামায়া তার মধ্যে যথেষ্ট রয়েছে। হাসুনির মায়ের প্রতি সে সমব্যথী। কিশোরী জমিলাকে সে সন্তানের মতো গভীর স্নেহ-মমতায় জড়িয়ে রাখে। মজিদ জমিলাকে শাস্তি দিলে রহিমা তো মেনে নিতে পারেনি। তাই স্বামীর কথায় সায় না দিয়ে সে সুস্পষ্টভাবে বলেছে- “ধান দিয়া কী হইব মানুষের জান যদি না থাকে? আপনে ওরে নিয়া আসেন ভিতরে।" মানবিক প্রাণধর্মের প্রেরণাতেই তার মাতৃত্বের জাগরণ ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটেছে। এই বৈশিষ্ট্যই তাকে ব্যতিক্রমী চরিত্রের মর্যাদা দিয়েছে।
তাহের-কাদেরের :
উপন্যাসের প্রথম দিকেই একজন বৃদ্ধ পুরুষ চরিত্রের স্বল্পক্ষণের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। এই ব্যক্তিই তাহের কাদেরের বাপ। নামবিহীন এ চরিত্রে অসম্ভব রাগ ও জেদ লক্ষ করা যায়। একসময় সে স্বাভাবিক, বুদ্ধিমান ও কর্মঠ ছিল। দুষ্ট প্রকৃতির এক বৈমাত্রেয় ভাইয়ের সঙ্গে জোতজমি নিয়ে মারামারি ও মামলা-মোকদ্দমা করে নিঃশেষ হওয়াতে তার অবস্থা এখন নয়। তার তিন ছেলে, এক মেয়ে। তিন ছেলে সংসারের বোঝা আর মেয়েটিও এক সন্তান নিয়ে তার বাড়িতেই। দারিদ্র্যের পীড়নে সে অতিষ্ঠ ও পরাজিত। স্ত্রীর সঙ্গে সে কলহ করে, মাঝে মাঝে তাকে প্রহারও করে। বৃদ্ধাও তাকে কুৎসিত ভাষায় গালাগাল দেয়, এমনকি তার পিতৃত্ব সম্পর্কেও কটাক্ষ করে। এ বিষয়ে তার নিজের মেয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে মজিদের নেতৃত্বে করা সামাজিক বিচারে সে মিথ্যাকেও স্বীকার করে নেয়। মজিদের কথা মতো সে বাড়ি এসে মেয়ের কাছে মাফ চায়। এ অপমান সহ্য করতে না পেরে সে ঐ রাতেই নিরুদ্দেশ হয়।
হাসুনির মা :
'লালসালু' উপন্যাসের এক দুস্থ দরিদ্র নারী হাসুনির মা। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই সে হামুনিকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বসবাস করতে থাকে। সেখানে জোয়ান ভাইদের মতো সে বসে বসে বাবার পরিশ্রমের অন্ন ধ্বংস করতে চায় না, তাতে তার। লজ্জা হয়। তাই সে বাড়ি বাড়ি ধান ভানার কাজ করে। শ্বশুরবাড়িতে সে যেতে চায় না, তার ভাষায় “তারা মনুষ্যি না।” বিয়ে করতেও তার আপত্তি। হাসুনিকে বড় করে তোলার মধ্যেই সে জীবনের আনন্দ খুঁজে পায়। কষ্টের মধ্যেও সে হাসি-খুশি। কাজের মধ্যেই তার সময় কেটে যায়। বাড়িতে এসে বাবা-মায়ের ঝগড়া, খুনোখুনি হওয়ার জোগাড় দেখে সে বিরক্ত হয়। বাবা নিখোঁজ হয়ে গেলে একধরনের অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করে, সে কাঁদে। ঝড় এলে হাসুনির মায়ের হৈহৈ করার অভ্যাস হলেও জীবনের কঠিন ঝড়ে সে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার জীবন থেকে আনন্দ চলে যায়।
আমিনা :
খালেক ব্যাপারীর রূপবতী প্রথম স্ত্রীর নাম আমিনা। মজিদের প্রথম স্ত্রী রহিমার মতো আমিনাও নিঃসন্তান। আমিনা আউয়াল্পুরের [ঈরের কাছ থেকে পানি পড়া খেতে চায়। খালের ব্যাপারী যাকে আউয়াল্পুরের পীরের কাছে পানি পড়া আনাতে পাঠায় সে আউয়াল্পুর না গিয়ে মজিদের কাছে গিয়ে সবকিছু বলে দেয়। সব জানতে পেরে মজিদ নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে খালেক ব্যাপারীকে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করে।
তানু :
খালেক ব্যাপারীর দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম তানু। তানু প্রতিবছর আস্ত আস্ত সন্তান জন্ম দেয় বলে আমিনা বিবির তা সহ্য হয় না।
ধনা মিয়া :
খালেক ব্যাপারীর দ্বিতীয় বউ তানু বিবির বড় ভাইয়ের নাম ধনা মিয়া। খালেক ব্যাপারী তাকে আওয়ানপুরের পীরের কাছে পানি পড়া আনার জন্য পাঠায়। কিন্তু সে ভয় পেয়ে আউয়ালপুর না গিয়ে মজিদের কাছে গিয়ে সব কিছু বলে দেয়।
মোদাব্বের মিয়া :
গ্রামের শিক্ষিত যুবক আক্কাসের বাবা হলেন এই মোদাব্বের মিয়া। রাগ উঠলে মোদাব্বের মিয়া তোতলায়। গ্রামের এক মজলিশে তার ছেলে আক্কাস স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা বললে তার ছেলেকে তিনি কেটে টুকরো করে নদীতে ফেলে দেওার কথা বলেন।
আক্কাস :
মহব্বত নগর গ্রামের এক শিক্ষিত যুবক আক্কাস। আক্কাস কিছুদিন ইংরেজি পরেছে। এখন সে গ্রামে স্কুল বানাতে চায় যাতে গ্রামের মানুষ কুসংস্কার থেক বের হয়ে আসতে পারে। কিন্তু মজিদ সেটা হতে দেয় না। আক্কাসের বাবা মোদাব্বের মিয়াও আক্কাসের রোধীতা করেন।
দুদু মিয়া :
সাত ছেলের বাবা হলেন দুদু মিয়া। মজিদ তাকে কামেলা জানার কথা জিজ্ঞেস ক্রলে সে ঘাড় ঘুরে আধাপাকা মাথা চুলকায়। মুখে তার লজ্জার হাসি। চোখ পিটপিট করে। মাথায় যেন ছিট। মজিদ তাকে ব্যাপারীর মক্তবে কালেমা শিখার আদেশ দেয়। কারণে অকারণে খেতে না পাওয়ার কথাটি বলাত আর অভ্যাস।
দুদু মিয়ার ছেলে :
তার বাবা দুদু মিয়ার অবস্থা দেখে খিলখিল করে হাসে। বাপের মাথা ঘুরানোর ভঙ্গিটা তার কাছে গাধার ভঙ্গির মতো মনে হয়।
কানুর বাপ :
মজিদকে এক ছিলিম তামাক এনে দেয়।
মতলব খাঁ :
ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। পীর সাহেবের পুরনো মুরিদ।
লোকটি :
যাকে মজিদ ধানের কথা জিজ্ঞেস করে। সে ঘাড় চুলকিয়ে নিতি-বিতি করে বলে যা হয়েছে তাই যথেষ্ঠ। ছেলেপুলে নিয়ে দুইবেলা খেতে পারার কথা বলে সে। তার কোনো একটা কথায় মজিদ বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
খোনকার মোল্লা শেখ :
সমাজের জানাযা পড়ায় এই খোনকার মোল্লা শেখ। তার বাড়ির সামনে মুর্তি নজড়ে পড়ে।
সরকারী কর্মচারী :
তিনি বাইরের বিদেশী; কিন্ত ভেতরে আসলে মুসলমান। তিনি গ্রামে পরদাদার আমলের কিছু কবরের কথা বলেন।
রেহান আলি :
গ্রামের মাতব্বর হলেন রেহান আলি। মজিদ যখন লোকদের গালাগাল করেন তখন তিনিও ছিলেন।
নানি-বুড়িঃ
খালেক ব্যাপারীর দ্বিতীয় স্ত্রী তানু বিবির কোলে নতুন সন্তান আসার সময় তার ডাক পড়ে। তিনি জানের আগামী বছর যখন তানু বিবির কোলে নতুন এক আগুন্তুক ট্যা ট্যা করে উঠবে তখন তার ডাক পড়বে।
মোদাসসের পীর :
নাম না জানা পীর। তাকে ঘিরেই মজিদের যত ভন্ডামি, অভিনয় ও আধিপত্য বিস্তার।
ছমিরুদ্দিন :
ছমিরুদ্দিন কোঁচবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। তার রক্তাক্ত দেহ দেখে আবেক-জাবেদের মনে দানিবীয় উল্লাস হওয়ার কথা কিন্তু তারা পাথর হয়ে যায়।
কালু মিয়া :
আউয়াল্পুরের সংঘর্ষে লিপ্ত হলে তার মাথা দু'ফাক হয়ে যায়।
ছুনুর বাপ :
মরণযোগে যন্ত্রণা পাচ্ছে। রহিমা তার জন্যে দোয়া করে।
খেতানির মা :
পক্ষাঘাতে কষ্ট পাচ্ছে। রহিমা তার জন্যে দোয়া করে।
Comments
Post a Comment